আজকে মহিলা মাদরাসায় আমার প্রথম ক্লাস। এমনকি জীবনে শিক্ষক হিসেবে ক্লাস করতে যাচ্ছি আজকেই প্রথম।
আজকের দিনটা আমার জীবনের এক বিশেষ অধ্যায়। আজ আমি প্রথমবারের মতো শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিতে যাচ্ছি। আগে বিভিন্ন সময়ে পড়িয়েছি, কিন্তু কখনোই পেশাদার শিক্ষকের ভূমিকায় ছিলাম না। আজ সেই সুযোগ এসেছে।
ত্বালহা ভাই আমাকে মহিলা মাদরাসার ক্লাসরুম পর্যন্ত নিয়ে যাচ্ছেন। পথে যেতে যেতে তিনি বিভিন্ন বিষয় বুঝিয়ে দিচ্ছেন, কোথায় কীভাবে কথা বলতে হবে, ছাত্রীরা কেমন, কীভাবে তাদের সামলাতে হবে। আমি মনোযোগ দিয়ে শুনছি, কিন্তু মনের ভেতর অন্যরকম এক অনুভূতি কাজ করছে। ভালো লাগা, দায়িত্ববোধ, আর একটুখানি ভয়—সব মিলিয়ে যেন এক অভূতপূর্ব অনুভূতি।
যে মাদরাসায় আমি প্রায় এক যুগ পড়েছি, সেই মাদরাসারই মহিলা শাখায় আজ আমাকে ক্লাস নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে! বড় হুজুর নিজ হাতে আমাকে মনোনীত করেছেন। এই সম্মানের অনুভূতিটা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তবে এর সাথে দায়িত্বও কম নয়। মিশকাত জামাতের ছাত্রীরা। নিশ্চয়ই বেশ বড় হবে। কীভাবে সামলাব? কীভাবে তাদের বোঝাব? যদি ঠিকমতো বোঝাতে না পারি....?
ক্লাসরুমে ঢুকে চোখ কপালে উঠে গেল। এতো পরিপাটি? সবকিছু এত গোছানো! মনে হলো, ঠিক যেন কোনো গল্পের পাতার বর্ণনা— ঝকঝকে বেঞ্চ, সুগন্ধি বাতাস, কোথাও এক চুল এলোমেলো নেই।
ত্বালহা ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, “এইভাবে কি আজকেই সাজানো হয়েছে, নাকি সবসময়ই থাকে?”
ত্বালহা হাসলেন। চেনা সেই রহস্যময় হাসি। “সবসময়ই তো এভাবেই থাকে।”
আমি চুপ করে গেলাম। আমার জন্য কোনো বিশেষ আয়োজনই করা হয়নি? এক চিলতে অভিমান যেন উঁকি দিল মনে।
রুমের একপাশে ভারী পর্দা ঝুলছে। প্রথমে ভেবেছিলাম, পর্দার পেছনেই ছাত্রীরা বসে আছে। ত্বালহা ভাই মাইক্রোফোন সেটাপ করতে করতে বললেন,
— এই যে তোমার মাইক্রোফোন, তোমার ছাত্রীরা দ্বিতীয় তলায় বসে তোমার কথা শুনবে। ওখানে একজন শিক্ষিকাও থাকবেন, তিনি তদারকি করবেন।
আমি একটু চমকে গেলাম।
— তাহলে কি পর্দার ওপাশে কেউ নেই?
ত্বালহা ভাই হাসলেন।
— না, এখানে কেউ নেই।
আমি একটু উঁকি দিয়ে দেখলাম, সত্যিই কেউ নেই। আর রুমটা ওদিকেও পরিপাটি, একদম সাজানো-গোছানো। পর্দার দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, তাহলে এখানে এই পর্দার প্রয়োজনীয়তাই বা কী? পরে বুঝলাম, এরও হয়ত দরকার আছে।
ত্বালহা ভাই চলে গেলেন আমাকে একা রেখে।
একটি নিস্তব্ধ কক্ষ।
আমি ধীরে ধীরে মাইক্রোফোনের সামনে বসলাম।
গভীর শ্বাস নিলাম।
“বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।”
আল্লাহর প্রশংসা দিয়ে শুরু করলাম।
কিন্তু তারপর?
কী বলব? সামনে তো কেউ নেই! আমি কি ঠিকঠাক বলতে পারছি? তারা কি বুঝতে পারছে?
আমি চোখ বন্ধ করলাম। কল্পনায় সামনে অনেক ছাত্রী বসিয়ে নিলাম।
আমি ধীরে ধীরে বলতে লাগলাম।
প্রারম্ভিক আলোচনা পাঁচ মিনিটের মতো চলল।
তখনই হঠাৎ—
পর্দার ওপাশ থেকে এক দরাজ গলার কণ্ঠ ভেসে এল। রাগ মেশানো কণ্ঠস্বর।
— হুজুর, একটু শুনবেন?
আমি চমকে উঠলাম। এ কণ্ঠ এক নারীর, কিন্তু যেন বজ্রের মতো শক্ত। চোখ খুলে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম।
— জ্বী, বলুন।
— আপনার ছাত্রীরা মাত্র ক্লাসে প্রবেশ করেছে। এতক্ষণ যা বলেছেন, তারা কিছুই শুনতে পায়নি। আপনি যদি আবার বলেন, তাহলে ভালো হয়।
আমি কিছুটা থমকে গেলাম। মনে হলো, এতক্ষণ ধরে যত চিন্তা করে যা বললাম, সবই বৃথা গেল! এখন আবার নতুন করে শুরু করতে হবে। কিন্তু অবাক লাগল শিক্ষিকার কণ্ঠ শুনে। সারাজীবন ভেবেছি, নারীদের কণ্ঠ মোলায়েম, আকর্ষণীয় হয়। কিন্তু এই শিক্ষিকা তো রীতিমতো ঝাড়ির সুরে কথা বললেন! একটু খারাপ লাগল, কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারলাম, এটা সঠিক। ইসলামে তো নারীদের কোমল স্বরে পরপুরুষের সাথে কথা বলা নিষেধ। তাহলে তিনি ঠিকই করেছেন। এই মাদরাসা শুধু দ্বীন শেখার জন্য নয়, আমল করার জন্যও।
আমি নিজের অনুভূতিগুলো সরিয়ে রেখে নতুন করে বলা শুরু করলাম। এবার যেন আত্মবিশ্বাস একটু বেশি। এই ঘটনার পর মনে হলো, আজকের প্রথম ক্লাসই আমাকে অনেক কিছু শিখিয়ে দিল।
[ঘটনাটি ২০২২ এর]
লিখাঃ HM Sharif (আমি 😊)